দেড় বছর আগে, বাংলাদেশের ‘জুলাই বিপ্লব’ সারা বিশ্বকে এক অভূতপূর্ব আশায় উজ্জীবিত করেছিল। স্বৈরাচারী হাসিনার ১৫ বছরের শ্বাসরুদ্ধ করা দুঃশাসনের পর, ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে বাংলার আপামর জনতা ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়েছিল, আর চিরতরে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচারী হাসিনা ও তার দোসর আওয়ামী লীগকে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর দেশের মানুষ পাহাড়সম আশা আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস নিয়ে ভরসা রেখেছিল; কথা ছিল তিনি সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করবেন।
কিন্তু আজ, দেড় বছর পর, সেই সব আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ইউনূস সরকার কাজের কাজ প্রায় কিছুই করে দেখাতে পারেনি। গোটা দেশ আজ চরম নৈরাজ্য নিমজ্জিত। যে ছাত্রনেতাদের কাঁধে ভর করে এই বিপ্লব, তারা মূলত শুধু সফল হয়েছে তাদের ওপর রাখা সমস্ত আশা-ভরসাকে গলা টিপে হত্যা করতে। জনসাধারণের মধ্যে আজ শুধুই চরম হতাশা আর মোহভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস । সবকিছু ধীরে ধীরে আবার সেই পুরনো পচা খোলসেই ফিরে যাচ্ছে।
আর এখন, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাতে—এদেশের আরেক দুর্নীতিগ্রস্ত, পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল।
এমন এক মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থানের পর, পরিস্থিতি আজ এই তলানিতে এসে ঠেকল কীভাবে?
ব্যাংকার, পুঁজিপতি ও ছাত্রদের নিয়ে গড়া ইউনূস সরকার
বিপ্লবের ঠিক অব্যবহিত পরেই, লাখো কোটি মানুষের কাছে সত্যি সত্যিই মনে হয়েছিল যেন এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম হতে যাচ্ছে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল ছাত্র কমিটি, আর অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিক ও সাধারণ মেহনতি মানুষও তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হচ্ছিল। পুলিশ পালানোর পর, তাদের জায়গায় রাস্তাঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছিল আত্মরক্ষা কমিটি। ছাত্ররা এমনকি স্বেচ্ছায় বিপ্লবের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতেও নেমে পড়েছিল, কারণ তারা তখন সত্যই এই বাংলাদেশকে নিজেদের বলে ভাবতে শুরু করে।
যদি এমন কোনো যোগ্য নেতৃত্ব থাকত, যারা এই কমিটিগুলোর দৃষ্টান্ত সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে, সত্যিকার অর্থে শ্রমিক শ্রেণিকে মাঠে নামিয়ে, এই কমিটিগুলোর হাতে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য লড়াই করতো, তবে বাংলাদেশের জন্য এক আমূল ভিন্ন পথের সূচনা হতে পারত। পুরোনো আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রযন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেত। যে গুটিকয়েক ধনী পরিবার ও বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে, তাদের ক্ষমতা এক চরম হুমকির মুখে পড়ত।
কিন্তু এই অবারিত সম্ভাবনাটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায় ছাত্রনেতারা হাসিনারই পদলেহী জেনারেলদের সাথে হাত মেলানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। বিপ্লবকে তার চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি স্বৈরশাসকের খুঁটি হিসেবে কাজ করা অর্থনৈতিক শক্তির মূলোৎপাটন করার বদলে, নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দিশা বা দল না থাকা এই ছাত্রনেতারা ক্ষমতা সেই তথাকথিত ‘দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের’ হাতেই ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর সাথে আঁতাত করে তারা বুর্জোয়া ‘বিশেষজ্ঞদের’ নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সাহায্য করে, এবং এর প্রধান হিসেবে বেছে নেয় এক উদারনীতিক, নোবেলজয়ী ব্যাংকার ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।
ইউনূস ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যে একজন ছাত্র-উপদেষ্টার ভাষায় “সবার কাছে গ্রহণযোগ্য”। একদিকে, তিনি “বিপ্লবের নায়কদের” স্তুতি গাওয়ার মিছিলে গলা মেলালেন এবং হাসিনার “ফ্যাসিবাদ” এর পতন উদ্যাপন করলেন। বিপ্লবের পিঠে চড়ে ওঠা ছাত্রনেতাদের মন জোগাতে তিনি কোনো কসুর করলেন না, এমনকি তাদের মধ্য থেকে দুজনকে-নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদকে—তার নতুন মন্ত্রিসভায় টেনে নিলেন।
অন্যদিকে, তিনি বারবার ধৈর্য ধরা এবং জাতীয় ঐক্যের বুলি আওড়াতে লাগলেন, যাতে সরকার নাকি বাংলাদেশ সংস্কারের কাজ করতে পারে। তার ভাষায়, “গোটা বিপ্লবটাই হলো সংস্কারের জন্য”। তার প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল প্রকাশ্যে সেইসব শিল্পপতি ও লুটেরা পুঁজিপতিদের সাথে হাত মেলানো, যারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই সরাসরি সম্প্রচারে এসে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর বিরুদ্ধে হাসিনার প্রতি তাদের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিল। তিনি এমনকি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনেরও ডাক দিলেন, যে দলটিকে তার একজন উপদেষ্টা “আমাদের অহংকার” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন!
অবশ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এই ‘বিপ্লবী’ ছদ্মবেশটি ধরে রাখতেই হতো। কিন্তু তাদের আসল মাথাব্যথা ছিল কেবল একটাই: বিপ্লবের এখানেই ইতি টানা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা ও বৈধতাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা, এবং আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
ইউনূস এবং তার পেছনের শাসকশ্রেণির কাছে, বিপ্লব যা হওয়ার তা যথেষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই অস্থিতিশীল ‘নৈরাজ্য’ তাদের শত শত কোটি টাকার ক্ষতি করছিল। তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এটি শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মনে এই আশা জাগিয়ে তুলছিল যে—যে অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছে, তা বুঝি তাদের নিজেদের ভাগ্যও বদলে দেবে। তাদের এই মোহ ভেঙে চুরমার করে দেওয়াটা শাসকশ্রেণির জন্য জরুরি ছিল। জুলাই বিপ্লবের পরের মাসগুলোতে শ্রমিকদের ধর্মঘট আর কারখানা অবরোধের এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে, যেখানে শ্রমিকেরা লড়াই করছিল তাদের নিজেদের কর্মস্থলের ‘ছোট ছোট হাসিনাদের’ বিরুদ্ধে। এর আগে ছাত্রদের দাবিগুলোর যেমন জবাব দেওয়া হয়েছিল, তেমনি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির জবাব দেওয়া হলো সরাসরি বুলেটের ভাষায়।
সুতরাং, ইউনূস সরকারের এই তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ অ্যাজেন্ডার সারমর্ম দাঁড়াল কেবল গালভরা প্রতিশ্রুতি বিলানো… আর সেই সাথে পুরোনো শোষণের চাকা সচল রাখা নিশ্চিত করা, অর্থাৎ বিদেশি পুঁজিপতিদের জন্য বাংলাদেশের শ্রমিকদের নির্মমভাবে শুষে খাওয়ার নিরবচ্ছিন্ন পথ খোলা রাখা।
রকমারি সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ার নাম করে ব্যাঙের ছাতার মতো হরেক রকম কমিশন গঠন করা হলো। কিন্তু আওয়ামী আমলের বেশিরভাগ বিচারক আর আমলা বহাল তবিয়তেই নিজেদের চেয়ারে রয়ে গেল। প্রতিবিপ্লবী গণহত্যার দায়ে গোটা দেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হলো মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে! নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, সেনাবাহিনী, এমনকি গুম-খুন আর চরম নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকেও (র্যাব) সম্পূর্ণ অক্ষত রাখা হলো। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন আর হত্যা আগের মতোই বীরদর্পে চলছে। পরিবর্তন যদি কিছু হয়ে থাকে, তবে তা কেবল তাদের পোশাকের রঙে।
এই পুরো প্রহসনে ছাত্রনেতাদের নির্লজ্জ আপসকামী ভূমিকা এক চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। সরকারের ভেতরে এবং বাইরে থেকে তারা তাদের সমস্ত কর্তৃত্ব সঁপে দিল ইউনূস এবং নতুন মোড়কে ফিরে আসা সেই পুরোনো পচা ব্যবস্থার হাতে। ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তি এক হও’—ইউনূসের এই ডাককে তারাই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করে বৈধতা দিল; আর এর মধ্য দিয়ে বাংলার আপামর জনতাকে সেইসব লুটেরা পুঁজিপতিদের পায়ে শেকল পরিয়ে বেঁধে দিল, যারা এতদিন বিরোধী দলে ছিল অথবা রাতারাতি নিজেদের জন্য একটা ‘হাসিনাবিরোধী’ কল্পকাহিনি ফেঁদে বসেছিল। ইউনূস এবং তার পুঁজিপতিদের মন্ত্রিসভা নিয়ে মানুষের মনে আজ যেটুকু মোহ বা বিভ্রান্তি টিকে আছে, তার জন্ম দিয়েছে এই ছাত্রনেতারাই।
শাসকশ্রেণির এই দালালি করার কড়ি তারা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে পেয়েছে। যে ছাত্রনেতারা মন্ত্রী (উপদেষ্টা) হিসেবে সরকারে ঢুকেছিল, তারা নিজেদের সুযোগ বুঝে গুছিয়ে নিয়েছে—বাস্তবে, পুরো ইউনূস মন্ত্রিসভার পকেটই ফুলেফেঁপে ভারী হয়েছে, আর উল্টোদিকে বাংলাদেশ দারিদ্র্যের আরও গভীর অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে।
কর্তৃত্বের চরম শূন্যতা
সরকারের চরম স্থবিরতার বিপরীতে, একের পর এক বৈপ্লবিক পরাঘাতে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন ডেপুটি কমিশনারের ভাষায়:
“মনে হচ্ছে ঢাকা যেন ‘বিক্ষোভের নগরীতে’ পরিণত হয়েছে—মানুষ নিজেদের দাবি আদায়ে সরকারি অফিসগুলোতে পর্যন্ত জবরদস্তক ঢুকে পড়ছে।”
পুলিশের কর্তৃত্বের যে চূড়ান্ত ধস নেমেছিল, তা এই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে পুলিশের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছে ১৪০০ এরও বেশি মানুষ। এই পৈশাচিক গণহত্যাকারী রূপই বিক্ষোভের আগুনকে বিপ্লবে পরিণত করে। সারা দেশে যখন আপামর জনতা রুখে দাঁড়ায়, তখন বাংলাদেশের বেশিরভাগ থানাই তারা পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। চরম আতঙ্কে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা লেজ গুটিয়ে পালায়, আর পুরো বাহিনী ‘ধর্মঘটে’ যাওয়ার (পড়ুন: আত্মগোপনে যাওয়ার) নাটক করে।
সাময়িকভাবে, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে রাস্তাঘাট পাহারার কাজে নামানো হয়েছিল। কিন্তু সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান যেমনটি সতর্ক করে বলেছিলেন, “সেনাবাহিনীর কাজ দেশ রক্ষা করা, পুলিশের কাজ করা নয়”, এবং “রাজনীতিতে নাক গলানো সেনাবাহিনীর জন্য ক্ষতিকর।”
এই ইউনূস সরকারের আসল মেরুদণ্ড হলো সেনাবাহিনী। যদি কখনো সাধারণ জনতার ওপর চূড়ান্ত দমন-পীড়ন চালানোর প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যরা , যারা নিজেদের দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি, তারা নিশ্চিতভাবেই বিদ্রোহ করে বসবে এবং বাহিনীতে ভাঙন ধরবে। তখন সম্পত্তিবানদের স্বার্থরক্ষাকারী কোনো সরকারেরই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কোনো শেষ রক্ষাকবচ আর অবশিষ্ট থাকবে না, ইউনূসের সরকারের তো নয়ই। আর ঠিক এ কারণেই, ইউনূসকে সেই পুরোনো, পচে যাওয়া পুলিশ বাহিনীকেই আবার নতুন করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়, কিন্তু এবার এমন এক বাহিনী নিয়ে, যাদের মনোবল একেবারে তলানিতে এবং যাদের কানাকড়িও কোনো কর্তৃত্ব আর অবশিষ্ট নেই।
গত এক বছর ধরে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে যেখানে ক্ষুব্ধ জনতা বন্দিদের ছাড়িয়ে আনতে থানায় হামলা চালিয়েছে, অথবা গ্রেপ্তার করতে আসা পুলিশকেই উল্টো গণপিটুনি দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই উত্তেজিত জনতা যখন নিজেদের ক্ষমতা খাটাতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রন নেয়, তখন পুলিশ বাধ্য হয়ে শক্তিহীন ও অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে।
সুতরাং, হাসিনার লৌহকঠিন হাতের জায়গায় ইউনূসের দুর্বল ও জীর্ণ হাত প্রতিস্থাপিত হওয়ার পর, এবং গণ-অভ্যুত্থানের সেই অসীম ক্ষমতার স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের মানুষের মনে টাটকা থাকায়, সব স্তরের মানুষ নিজেদের দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছে।
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মাসের পর মাস ধরে বিক্ষোভ, ধর্মঘট আর অবস্থান কর্মসূচি চলেছে। শেষমেশ, মালিকপক্ষ মজুরি বাড়াতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, ইউনূসের এই তথাকথিত ‘নতুন বাংলাদেশে’ নিজেদের ন্যায্য অধিকারের জন্য বিক্ষোভ করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন তিনজন শ্রমিক।
ঢাকায়, নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ে মরিয়া হয়ে শিক্ষক, ব্যাংক কর্মচারী, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে এমনকি আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত একের পর এক সরকারি ভবন ঘেরাও করে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
যতদিন পর্যন্ত ছাত্রনেতাদের প্রতি মানুষের সমর্থন অবশিষ্ট ছিল, ততদিন তারা নিজেদের ইচ্ছে পূরণের জন্য লাগাতার বিক্ষোভের ডাক দিতে পেরেছিল। বিপ্লবের ঠিক পরপরই, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে গদিছাড়া করতে এক তুমুল বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিতে ছাত্ররা এক ‘বুলডোজার মার্চ’-এর নেতৃত্ব দেয়। সবশেষে, ২০২৫ সালের মে মাসের দেশব্যাপী দুর্বার গণবিক্ষোভ ইউনূসকে তার শাসনকালের একমাত্র তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য করে: আর তা হলো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।
বিপ্লবের ঠিক পরপরই আমরা যেমনটা পূর্বাভাস দিয়েছিলাম:
“তারা যেটুকু উদারনৈতিক বা গণতান্ত্রিক সংস্কারই বাস্তবায়ন করুক না কেন, তা আসবে কেবল রাজপথে নেমে আসা উত্তাল জনতার প্রচণ্ড চাপের মুখেই; এটি তাদের কোনো ‘চতুর’ আপস-মীমাংসার ফসল হবে না, বরং এর মধ্য দিয়ে এই নগ্ন সত্যটাই প্রতিফলিত হবে যে—বিপ্লবী জনতার রুদ্ররোষের মুখে খোদ সেনাবাহিনীই আজ নিজেদের চরম কোণঠাসা ও ভীতসন্ত্রস্ত বলে মনে করছে।”
এর ফলশ্রুতিতে, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এর নামে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার চুনোপুঁটি আর পাতি মাস্তানকে গ্রেপ্তার করা হলো, আর সেই সাথে ধরা পড়ল হাতেগোনা কয়েকজন হাই-প্রোফাইল মন্ত্রী। শীর্ষ নেতাদের কথা বলতে গেলে, তাদের বেশিরভাগই আগেভাগে লেজ গুটিয়ে বিদেশে পালিয়েছে, যাদের বিচার কেবল তাদের অনুপস্থিতিতেই (in absentia) করা সম্ভব। অথচ, আমরা ঠিকই দেখতে পাচ্ছি, স্বৈরাচারী ওই দানবীয় শাসনযন্ত্রের আসল কারিগররা—রাষ্ট্রের রাঘববোয়াল আমলা আর লুটেরা ব্যবসায়ীরা—সব ধরনের কঠিন বিচার ও জবাবদিহিতা অনায়াসেই এড়িয়ে গেছে, এবং এখন তারা নতুন প্রভুদের অধীনে বহাল তবিয়তে নিজেদের ধান্দা চালিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক নৈরাজ্য
স্থিতাবস্থায় আঘাত হানা এই দুটি বড় ঘটনা—আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা এবং পুলিশকে দুর্বল করে দেওয়া—গভীর ও সুদূরপ্রসারী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি দেয়।
পুলিশের এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থার সুযোগে—এবং বিপ্লবের সময় লুট হওয়া হাজার হাজার অস্ত্র আজও উদ্ধার না হওয়ার ফলে—পুরো বাংলাদেশ এক ভয়াবহ অপরাধের জোয়ারে নিমজ্জিত হয়েছে। ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ আর খুনখারাপি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অপরাধী গ্যাংগুলো আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, কারণ পুলিশের সেই ‘ধর্মঘটের’ সময় তাদের অনেক নেতাই বুক ফুলিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। গণপিটুনি ও হত্যার অন্তত ১৫০টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে: কিছু ক্ষেত্রে, ছিনতাইকারীদের হাত থেকে বাঁচতে জনতা নিজেরাই অস্ত্র তুলে নিয়েছে; আবার কিছু ক্ষেত্রে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পিটিয়ে মারা হয়েছে।
এরই মধ্যে, আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণের জন্য এক চরম বিশৃঙ্খল ও লাগামহীন ইঁদুর দৌড় শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রের অধীনে, লুটপাটের বখরা ও পৃষ্ঠপোষকতার একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত কেবল তারাই। দেশটি বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হলেও, এর মধ্যে লুটপাটের এক ধরনের স্থিতিশীলতা ও অনুমানযোগ্যতা ছিল। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষায়:
“আওয়ামী আমলে, পুলিশ প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করত, যারা স্থানীয় বিরোধগুলো মিটিয়ে ফেলত… সেই কাঠামো এখন আর নেই। এখন একাধিক গোষ্ঠী… বাজার, বাসস্ট্যান্ড আর সরকারি দরপত্র (টেন্ডার) নিয়ন্ত্রণের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।”
এখন যেন চারদিকে হরিলুট চলছে। বাসের রুট থেকে শুরু করে ইটের ভাটা, মাছের আড়ত আর ছাত্রদের মেস বা হল—যেখান থেকেই চাঁদাবাজি করা সম্ভব, তার সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিতে এক চরম নৈরাজ্যকর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে।
আর এসবের ফয়সালা হচ্ছে কাঁচা টাকা আর অস্ত্রের জোরে। ঘুষের রাজত্ব এখন চরমে, আর রাজনৈতিক সহিংসতার শত শত ঘটনা ঘটে চলেছে: স্রেফ ইন্টারনেটের তার দখল, ভাঙারির দোকান দখল, আর চাঁদার টাকা না দেওয়ার মতো তুচ্ছ কারণে মানুষকে খুন করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের লাগামহীন দুর্নীতির প্রতি তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ থেকেই জুলাই বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া জায়গা দখল করতে যে পাতি মাস্তান আর গ্যাংস্টারদের ঢল নেমেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের পুঁজিপতিরা কেবল দুর্নীতি, ডাকাতি আর লুটপাটের ওপর ভর করেই টিকে থাকে।
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্তিত্বই টিকে আছে এই লুটেরা শ্রেণির অপরাধমূলক সম্পদ বৃদ্ধি নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে এবং তাদের অবৈধ অর্জনগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য। এর বাইরে কোনো ‘ভদ্র’ পুঁজিবাদ বা এর চেয়ে বেশি কোনো ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনীতির অস্তিত্ব থাকা একেবারেই অসম্ভব।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিকে স্রেফ পুরোনো মাস্তানদের জায়গা দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠা প্রতিদ্বন্দ্বী মাফিয়াদের মধ্যকার এক নোংরা লড়াই ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। ক্ষমতার এই নির্লজ্জ কাড়াকাড়িতে সব দলই সমানভাবে মত্ত হয়ে আছে।
এই সবকিছুর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বিপ্লবের মুখে আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী ও লুটেরাদের দেশ থেকে পালানোর ফলে শত শত পোশাক কারখানা মুখ থুবড়ে পড়েছে। নতুন করে ১ লাখ ৩০ হাজার পোশাক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে, যা আগে থেকেই বেকার থাকা ২৬ লাখ মানুষের মিছিলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেই কাজগুলো আর ফিরে আসেনি, কারণ এমন চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে পুঁজিপতিরা কোনোভাবেই নতুন করে বিনিয়োগ করতে রাজি নয়।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি হু হু করে বাড়ছে, আর ঋণের বিশাল পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে গোটা অর্থনীতি আজ ধুঁকছে। রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়া রাজস্বের পাক্কা ২২ শতাংশই এখন ঋণের সুদ টানতেই গিলে খাচ্ছে। এর জবাবে, এই অনির্বাচিত ইউনূস সরকার কেবল কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের খড়্গই চাপিয়ে দেয়নি, বরং দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বার্ষিক বাজেটের আকারও ছেঁটে ফেলেছে। এটি এক অশনিসংকেত যে, ১৫ বছর ধরে হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখা সেই বহুল চর্চিত ‘বেঙ্গল টাইগার’ এর (অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফাঁপা রূপকথার) দিন আজ চিরতরে ফুরিয়েছে।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো, বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’খ্যাত তৈরি পোশাক শিল্পও (গার্মেন্টস খাত) আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে। এই শিল্প এখন ক্রমশই ভারতের সস্তা সুতার ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে, প্রথমত বাংলাদেশের নিজস্ব সুতা শিল্প ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে; আর দ্বিতীয়ত, ভারত যদি কোনো কারণে এই সুতা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তবে আমাদের গোটা তৈরি পোশাক শিল্প এক ভয়াবহ খাদের কিনারায় গিয়ে পড়বে—বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে এসে ঠেকেছে।
একের পর এক ধেয়ে আসা এসব পুঞ্জীভূত সংকটের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ইউনূস সরকার আজ পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত; তাদের গালভরা প্রতিশ্রুতির সেই তথাকথিত ‘সংস্কার’ এর একবিন্দুও বাস্তবায়ন করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, খোদ ইউনূস নাকি পদত্যাগ করার কথাও ভাবছিলেন; খবর বেরিয়েছিল যে, তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে চারপাশের এই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের কাছে তিনি নিজেকে “জিম্মি” বলে মনে করছেন। স্পষ্টতই, এই ডুবন্ত জাহাজের হাল ধরে এর চেয়ে ভালো কিছু করার মতো দ্বিতীয় কোনো ত্রাতা এই শাসকশ্রেণি আর খুঁজে পায়নি।
‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন
গত সপ্তাহের নির্বাচনের পেছনে এই ছিল এক চরম বিশৃঙ্খল ও ন্যক্কারজনক প্রেক্ষাপট। ইউনূস অনেক দিন ধরেই এই ক্ষমতা নামক জ্বলন্ত অঙ্গার হাতবদল করে নিজের পুরোনো ব্যাংকিং ব্যবসায় ফিরে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ছিলেন। ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত জেনারেলরা সংস্কার হোক বা না হোক, তড়িঘড়ি করে নির্বাচন চাপিয়ে দিতে আরও বেশি উদ্গ্রীব ছিলেন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যেমনটা বলেছিলেন:
“বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আর তা কেবল একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই সম্ভব।”
আর পুঁজিপতিদের এত মরিয়া হয়ে ওঠা এই কাঙ্ক্ষিত ‘স্থিতিশীলতা’ ঠিক কাদের এনে দেওয়ার কথা?
হাসিনার পতনের পর গত দেড় বছরে, ছাত্রনেতারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাজপথের বিপ্লবী জনতাকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের নিষ্ক্রিয় করেছে, জুলাই বিপ্লবের সেই উন্মাদনাময় দিনগুলোতে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতির সাথে এই সরকার চরম বেইমানি করেছে, আর রাজনীতি পরিণত হয়েছে লুটপাটের বখরা নিয়ে কাড়াকাড়ি করা দুর্নীতিগ্রস্ত গ্যাংগুলোর এক চরম নোংরা ও ঘৃণ্য তামাশায়।
সাধারণ জনতার সামনে আস্থা রাখার মতো কোনো রাজনৈতিক বিকল্প বা কেন্দ্রবিন্দু না থাকায়, নির্বাচনটি স্বভাবতই দীর্ঘকাল ধরে শিকড় গেড়ে থাকা দুটি পুরোনো দলের মধ্যকার এক দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়: যার একদিকে ছিল পরিবারতান্ত্রিক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যাদের জন্ম জিয়াউর রহমানের প্রতিবিপ্লবী স্বৈরতন্ত্রের গর্ভ থেকে; আর অন্যদিকে ছিল জামায়াতে ইসলামী, যাদের উদ্ভব ১৯৭১ সালের প্রতিবিপ্লবী ও দেশদ্রোহী রাজাকারদের প্রেতাত্মা থেকে। এই দুই দলই আগে রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করেছে। বস্তুত, হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের আগে, তারা একসাথে জোট বেঁধেই দেশ শাসন করেছিল।
জামায়াতে ইসলামী হলো একটি ইসলামপন্থী দল, যাদের সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডের যোগসাজশ রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই এরা একটি চরম রক্ষণশীল এবং ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক দল। যখন তারা বিএনপির সাথে ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চালাতে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
তবে, জুলাই বিপ্লবের পটভূমিতে তারা পুরোপুরি নিজেদের সুর পাল্টে ফেলে। দলটির জাতীয় নেতৃত্ব চরম সুবিধাবাদিতার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের একনিষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে নতুন মোড়কে হাজির করে। এমনকি তারা নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীকেও নির্বাচনে দাঁড় করায়! তাদের আমির শফিকুর রহমান জুলাই বিপ্লবকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ আখ্যা দিয়ে এর স্তুতি গান—যা চরম হাস্যকর, কেননা জামাত এই দেশের প্রথম স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই অস্ত্র হাঁতে নিয়েছিল!
হাসিনার আমলে চরম রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে দলটি সাধারণ মানুষের কাছে এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল। তাদের এই খোলস পাল্টানো, দাতব্য কাজের আড়ালে গরিব মানুষের সাথে গড়ে তোলা সখ্য, এবং সবচেয়ে বড় কথা—চরম দুর্নীতিগ্রস্ত বিএনপির একমাত্র বিকল্প হিসেবে নিজেদের দাঁড় করানোই ছিল নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের এই উল্কাবেগে উত্থানের মূল চাবিকাঠি। আর এর ফলেই তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে এক নজিরবিহীন নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে আনে, যা মূলত বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের এক সুস্পষ্ট ব্যারোমিটার।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিকভাবেই বিএনপি হলো পরিবারতন্ত্র ও লুটেরা পুঁজিপতিদের এমন একটি ইসলামপন্থী ও মার্কিন-ঘেঁষা দল, যারা সব সময়ই আওয়ামী লীগকে ঘিরে থাকা আধিপত্যশীল পরিবারতান্ত্রিক ও লুটেরা পুঁজিপতি গোষ্ঠীর সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে মত্ত ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের সিংহভাগ জুড়েই মূলত এই দুটি রাজবংশ নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার হাতবদল করেছে।
নির্বাচনের পরিক্ষা পার হতে বিএনপিও নিজেদের খোলস পাল্টে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আর ‘দুর্নীতিবিরোধী’ ক্রুসেডার হিসেবে জাহির করেছিল; স্রেফ জামায়াতের তুলনায় একটি ‘কম খারাপ দল’ (lesser evil) হিসেবে নিজেদের প্রমাণের মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের কলঙ্কজনক অতীত ইতিহাসই তাদের আসল স্বরূপ উন্মোচন করে দেয়। বিএনপি যখন শেষবার ক্ষমতায় ছিল (এই জামায়াতের সাথেই জোট বেঁধে), তখন এই বাংলাদেশ টানা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের লজ্জাজনক মুকুট পরেছিল। দলটির বর্তমান প্রধান তারেক রহমান—যিনি আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গদিতে বসেছেন—তাকে মার্কিন দূতাবাসের এক ফাঁস হওয়া তারবার্তায় “লুটেরা সরকার এবং চরম সহিংস রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতীক” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল, যিনি “নির্লজ্জভাবে এবং লাগাতার ঘুষ দাবির” জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তিনি হলেন বাংলাদেশের এই লুটেরা বখরা-বাঁটোয়ারা আর পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির এক আদ্যোপান্ত গ্যাংস্টার।
নির্বাচনের আগে ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য দলটি তাদের চরম নোংরা আর লাগামহীন অপকর্মগুলোতে কিছুটা লাগাম টানার নাটক করেছিল। দল থেকে হাজার হাজার বিএনপি কর্মীকে লোকদেখানো বহিষ্কার করা হয়েছিল। বিএনপির একজন প্রার্থী তো তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষা চেয়ে বলেছিলেন:
“দুই হাত জোড় করে বলছি, ১২ তারিখ [ফেব্রুয়ারি ১২, নির্বাচনের দিন] পর্যন্ত চাঁদাবাজিটা করবেন না!”
কিন্তু এই কাকুতি-মিনতিও লুটেরাদের এই ইঁদুর দৌড় থামাতে পারেনি। গত দেড় বছর ধরে দেশে যত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার সিংহভাগেই এই বিএনপি ক্যাডারদের সরাসরি হাত ছিল। এমনকি খোদ দলের ভেতরেও, লাভজনক রাজনৈতিক পদবাণিজ্যের দখল নিতে প্রার্থীদের মধ্যে এক চরম নোংরা ও সর্বগ্রাসী কামড়াকামড়ি চলেছে, কারণ এই পদগুলোই হলো অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ার আসল চাবিকাঠি।
বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক ছাত্রদল নেতা আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “তারা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, আমি যদি নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে থাকি, তবে তারা আমার হাত-পা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।” জাতীয় নেতাদের মুখে আওড়ানো মিষ্টি মিষ্টি বুলির চেয়ে এই হুমকি-ধমকির চিত্রটাই হলো এদেশের নির্বাচনী ইঁদুর দৌড়ের সবচেয়ে নগ্ন ও আসল স্বরূপ।
এই বাংলাদেশে, পুঁজিপতি আর তাদের উচ্ছিষ্টভোগী দালালরা যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, তার পুরোটাই আসে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের হাত ঘুরে। এই রাষ্ট্রই তাদের হাতে তুলে দেয় সরকারি বড় বড় কন্ট্রাক্ট, খাসজমি, লাইসেন্স আর পুলিশের প্রটেকশন। এই রাষ্ট্রই বিদেশি পুঁজি আর দেশীয় লুটেরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে দালালি ও মধ্যস্থতা করে। রাজনৈতিক ক্ষমতাই হলো এখানে টাকা ছাপানোর আসল মেশিন; আর ঠিক এ কারণেই, বাংলাদেশের তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ সব সময়ই ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং এই লুটপাটের বখরা একচেটিয়াভাবে কুক্ষিগত করার এক চরম রক্তক্ষয়ী লড়াই—যার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেদের অনুগত ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলা এবং একেকটা লাভজনক জমিদারি কায়েম করা। তাই এতে বিন্দুমাত্র অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এবারের নির্বাচনী দৌড়ে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই ছিল কোটিপতি, যারা কেবল নিজেদের লুটপাটের সাম্রাজ্যকে আরও পাকাপোক্ত করতেই মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছিল।
কোথায় গেল ছাত্ররা?
এই পুরো ডামাডোলের মধ্যে যে কারও মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে: যে ছাত্ররা জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা আজ কোথায়?
নির্বাচনের এই ইঁদুর দৌড় শুরু হওয়ার আগেই, ইউনূসের প্রতি অন্ধ ও দাসসুলভ আনুগত্য এবং নিজেদের ছাঁচে ঢালা সুবিধাবাদী, ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদে পরিণত করার কারণে ছাত্রনেতাদের সমস্ত নৈতিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি ধূলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এই ছাত্রনেতাদের এমন প্রবল দাপট ও কর্তৃত্ব ছিল যে, তারা যদি সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক ও সামাজিক দাবির ভিত্তিতে একটি বিপ্লবী দল গঠনের ডাক দিত, তবে সেই দল মুহূর্তের মধ্যেই এক অপ্রতিরোধ্য গণশক্তিতে পরিণত হতো। এর সামনে যা কিছু আসত, সবকিছু খড়কুটোর মতো ভেসে যেত।
কিন্তু নেতারা তেমন কোনো দলই গঠন করল না। কেবল ২০২৫ সালের মে মাসে এসে, খোদ ইউনূসের ইশারায় তারা নিজেদের একটি রাজনৈতিক দল খোলার সিদ্ধান্ত নিল: জাতীয় নাগরিক পার্টি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি – এনসিপি)। তারা অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে দ্বিতীয় রিপাব্লিক, গণতন্ত্র আর দুর্নীতি দমনের ফাঁকা বুলি আওরায়।
তবে, গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিটি অপকর্মের দায়ভার এই নেতাদেরই নিতে হবে। দিনশেষে, তারা আর দশটা পচা রাজনৈতিক দলের চেয়ে কোনো অংশে আলাদা নয়, যারা কেবল মুখে ‘সংস্কার’ আর দুর্নীতি দমনের গালগল্প শোনায়—যে দুর্নীতির পঙ্কিলতায় খোদ এনসিপি নেতারাই আজ আকণ্ঠ নিমজ্জিত।
জুলাই বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই, প্রতিটি সুবিধাবাদী ধান্দাবাজ রাতারাতি আন্দোলনের ‘ছাত্র সমন্বয়ক’ এর আসল বা ভুয়া তকমা ঝুলিয়ে সরকারি অফিসগুলোতে গিয়ে চাকরির দাবি দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই নির্লজ্জতার সুরটা বেঁধে দিয়েছিল খোদ সবচেয়ে পরিচিত ছাত্রনেতারাই। দেখা গেছে, ছাত্রনেতারা একশো গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে রাজকীয় কায়দায় নিজেদের জন্মস্থানে ফিরছে। অন্যরা নিজেদের পদবি ব্যবহার করে বেপরোয়া চাঁদাবাজি আর দুর্নীতির আখড়া গড়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, এনসিপি এর এক সমন্বয়ককে নিজেরই ডাকা একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করার বিনিময়ে প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করতে ক্যামেরায় ধরা পড়তে দেখা গেছে।
ছাত্রনেতাদের এই চরম বেইমানির সবচেয়ে তিক্ত ও নির্মম পরিহাসটি লুকিয়ে আছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের মূল দাবিটির চূড়ান্ত পরিণতির মধ্যে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল- যা অধিকাংশ বাংলাদেশিদের একমত ছিল- মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি চাকরিতে থাকা কোটা প্রথার মূলোৎপাটন করা। সবাই খুব ভালো করেই জানত যে এই কোটাগুলো হাসিনার অনুগত চামচাদের পুরস্কার হিসেবেই ব্যবহৃত হতো।
আমরা সেই সময়েই জোরালো যুক্তি দিয়েছিলাম যে, চাকরিতে নিয়োগের এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করার একমাত্র কার্যকরী পথ হলো ‘সকলের জন্য কর্ম’-এর দাবিকে সামনে নিয়ে আসা। একমাত্র একটি সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতিই এমন কিছুর নিশ্চয়তা দিতে পারে।
এর বদলে ইউনূস সরকার আসলে কী করল? হ্যাঁ, সেই পুরোনো কোটা বাতিল করা হলো ঠিকই… কিন্তু তার জায়গায় চাপিয়ে দেওয়া হলো ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন চাকরির কোটা! সোজা কথায়, পুরোনো লুটেরা গোষ্ঠীর বখরা-বাঁটোয়ারার ব্যবস্থাটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে, তার জায়গায় নতুন এক গোষ্ঠীর জন্য নতুন এক বখরা-বাঁটোয়ারার ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা কায়েম করা হলো।
এবারের নির্বাচনে আদর্শগত বা নীতিগতভাবে এনসিপিকে আলাদা করার মতো মৌলিক কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কেউ যদি বিএনপির বদলে অন্য কোনো শক্তিকে ভোট দিতে চাইত, তবে সে স্বাভাবিকভাবেই জামায়াতকেই বেছে নিত। শেষমেশ, এনসিপি ওই জামায়াতের সাথেই নির্বাচনী আঁতাত করে বসল, যার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যকার নীতিগত পার্থক্যের শেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছে গেল।
ছাত্রনেতাদের এই লজ্জাজনক সুবিধাবাদিতা আর শাসকশ্রেণির কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান ব্যতিক্রমিদের একজন ছিলেন ওসমান হাদি। বিপ্লবের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া ছাত্র সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হাদি, যিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রচারণার মতো প্রতিটি লড়াই-সংগ্রামে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
হাদির রাজনীতি ছিল চরম বৈপরীত্যে ভরা: তিনি পপুলিজম (জনতুষ্টিবাদ) আর ইসলামপন্থার এক জগাখিচুড়ি পাকিয়েছিলেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু একই সাথে তিনি বিএনপি এবং এনসিপি এর দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তার লড়াকু, আপসহীন ও গণমুখী বাগ্মীতা এবং অন্যান্য বিক্রি হয়ে যাওয়া ছাত্রনেতাদের থেকে তার দূরত্ব তাকে রাতারাতি এক তুমুল জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছিল, যিনি মানুষের চোখে হয়ে ছিলেন জুলাই বিপ্লবের আদর্শের এক অবিচল, কলঙ্কমুক্ত লড়াকু সৈনিক।
তিনি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, এক গুপ্তঘাতকের বুলেটে হাদির মাথা বিদ্ধ হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি এক মহান শহীদে পরিণত হন। আর এর জেরে গোটা দেশজুড়ে এক বিশাল ভারতবিরোধী বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এই বিক্ষোভগুলো কোনোভাবেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই সুশৃঙ্খল বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের মতো ছিল না। জুলাইয়ে, সাধারণ জনতার সামনে ছাত্রদের এক সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ছিল, এবং কোটা প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই ও হাসিনার পতনের মতো এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। আপামর জনতা তাদের সমস্ত ক্ষোভ আর ঘৃণার বারুদ ওই দুর্নীতিগ্রস্ত হাসিনা চক্রের দিকেই তাক করেছিল।
দেড় বছর পর আজ হাসিনা নেই ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এরপর কোথায় যেতে হবে, সেই দিশা বা গন্তব্য আজ কারোরই জানা নেই। দিশেহারা, বিক্ষুব্ধ এবং কোণঠাসা জনতা কেবল অন্ধের মতো সেইসব কিছুর ওপরই হামলে পড়েছিল, যেগুলোকে তারা ধর্মনিরপেক্ষ ও ভারত-সমর্থিত সেই পুরোনো পচা শাসনব্যবস্থার প্রতীকী অবশিষ্টাংশ হিসেবে মনে করেছিল।
ডিসেম্বরের সেই বিক্ষোভে ভারতীয় কনস্যুলেট ঘেরাও করা হলো। প্রাক্তন আওয়ামী নেতাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো, রেহাই পেল না এক বিএনপি নেতার বাড়িও। এক হিন্দু ব্যক্তিকে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেট্রোল বোমা মারা হলো। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়গুলো আগুনে ভস্মীভূত করা হলো।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র?
শেষ পর্যন্ত, তথাকথিত ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন—যেখানে ভোটকেন্দ্রে বোমা হামলা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও জাল ভোট প্রদান এবং ভোট কেনার মতো নির্লজ্জ ঘটনা ঘটেছে—তাতে জয়লাভ করেছে বিএনপির তারেক রহমান। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে নারীদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে এমন যৌক্তিক ভীতিকে পুঁজি করে বিএনপি একচেটিয়া ভূমিধস বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে; তারা একাই পেয়েছে ২১২টি আসন, যেখানে জামায়াতের জুটছে ৭৭টি আর এনসিপির কপালে জুটেছে মাত্র… ৬টি।
বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন’ হিসেবে ঢোল পেটানো এই প্রহসনে ভোট দিতে এসেছিল ৬০ শতাংশেরও কম মানুষ। একজন সাধারণ রিকশাচালক গোটা দেশের এই হতাশাজনক অবস্থাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন:
“আমরা সুযোগটা হারিয়ে ফেলেছি। জুলাই মাসে মানুষ একদম খামোখাই জীবন দিয়েছে… আমি তাও ভোট দেব, এই জন্য না যে আমি কোনো পরিবর্তনের আশা করি, কিন্তু এই জন্য যে এছাড়া আর কিছুই করার বাকি নেই। আমি একদম বিশ্বাস করি না যে এই নির্বাচন আমার জীবনে—বা এই দেশে—কোনো অর্থের পরিবর্তন আনবে।” [আল-জাজিরা প্রতিবেদন থেকে অনুবাদিত]
এই রিকশাচালকের কয়েকটি বাক্যে কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং তথাকথিত সমস্ত ‘জেন জি’ বিপ্লবগুলোতে উদারনৈতিক বিরোধীদের (liberal opposition) বিশ্বাসঘাতকতার পুরো চিত্রটিই তুলে ধরেছেন। আপামর জনতা তাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ দেখেছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে তারা অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু উদারনৈতিক বিরোধী নেতারা বলল, ‘না, নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করো।’ চরম সংকটের মুহূর্তে তারা এই পচা শাসনব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করল; আর যখন সেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন এল, তখন সাধারণ মানুষ চরম হতাশা আর মোহভঙ্গ নিয়ে শুধু ‘আর কিছু করার নেই’ বলে ভোটকেন্দ্রে গেল।
নির্বাচনের ঠিক একই সময়ে, বাংলাদেশের মানুষকে সংবিধানের ওপর একটি গণভোটে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। এটি ছিল ইউনূসের বিদায়ী উপহার, পরবর্তী সরকারের বাস্তবায়নের জন্য উদারনৈতিক সংস্কারের এক কাল্পনিক ফর্দ। এটি একটি কেতাবি দলিল, যার স্বপ্ন হলো ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য এবং একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল বুর্জোয়া গণতন্ত্রে পরিণত করা।
এটি পাসও হয়ে গেল; কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন মাথা নিচু করে এই ব্যবস্থা মেনে নিচ্ছে, আর তাদের মাথার ওপর দিয়ে দুর্নীতি আর পদলেহনের এক নগ্ন উল্লাস চলছে, তখন এই দলিলটি অচিরেই একটি অর্থহীন মৃত কাগজে পরিণত হবে। ঠিক একইভাবে, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের পতনের পরও বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, স্বাধীন বিচারবিভাগ এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক সংস্কারের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু রাজপথ থেকে জনতার ঢল একবার ঘরে ফিরে যাওয়ার পর, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য দলগুলো একে অপরের ওপর হিংস্র কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই পরবর্তীতে হাসিনা স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটেছিল।
এটাই হলো বাংলাদেশের পুঁজিবাদের আসল চরিত্র। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে যেখানে একটি শক্তিশালী, ধনী এবং স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণি রয়েছে যারা ‘গণতন্ত্র’এর মোহ টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের দিকে কিছু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেখানে বাংলাদেশের দুর্বল, দালাল পুঁজিবাদী শ্রেণি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই পুরোপুরি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের একটি ফাঁস হওয়া কথোপকথন এই আসল চিত্রটি একেবারে নগ্নভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, বিএনপি “নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণেই ধ্বংস হয়ে যাবে” এই আশঙ্কায় জামায়াতে ইসলামীর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছিল। সেই রেকর্ডিংয়ে, একজন মার্কিন কর্মকর্তা নারী সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলছিলেন যে জামাত শেষমেশ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছেই দায়বদ্ধ থাকবে:
“বাংলাদেশের গোটা অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রে আপনাদের রপ্তানির ২০ শতাংশই নির্ভর করে কয়েকটি সামাজিকভাবে প্রগতিশীল পোশাকের চেইন শপ ও ব্র্যান্ডের ওপর… যদি আর কোনো অর্ডার না আসে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির অস্তিত্বই থাকবে না… আমরা চাই [জামাত] আমাদের বন্ধু হোক, কারণ আমরা চাইলেই যেন ফোন তুলে বলতে পারি, ‘আপনারা এইমাত্র যে কথাটা বললেন। এর পরিণতি কিন্তু এমন হতে যাচ্ছে।'”
বাংলাদেশের এই তথাকথিত অর্থনৈতিক ‘অলৌকিকতার’ পুরো ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে এই চরম সত্যের ওপর যে এই বিদেশি ক্রেতারাই হলো বাংলাদেশের আসল প্রভু, যারা বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা মজুরিতে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে নির্মমভাবে তিব্র শোষণ করতে পারে।
আর ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে একটি নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা বজায় রাখা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই লাভজনক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে, লাখ লাখ শ্রমিককে কার্যত দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক অধিকারের কোনো অর্থবহ আলোচনাই সম্ভব নয়, কারণ তা হলে বাংলার তৈরি পোশাক শিল্পের সেই ‘প্রতিযোগিতামূলক’ সস্তা মজুরির ভিত্তিটাই ধসে পড়বে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র যেহেতু এখানে আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজিপতি এবং স্থানীয় শোষকদের মাঝখানে কেবল একজন দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করে, তাই বাংলাদেশের পুঁজিপতিদের ভাগ্য পুরোপুরি নির্ভর করে ক্ষমতাসীন দলের সাথে তাদের আঁতাতের ওপর। যেহেতু এখানে লুটপাটের বিশাল বখরা জড়িত, তাই যে রাজবংশই ক্ষমতার মসনদে বসুক না কেন, তারা এই মধুভাণ্ডের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে মরিয়া হয়ে উঠবে। এই ব্যবস্থাটি হলো ‘উইনার-টেকস-অল’ এখানে নিরপেক্ষতা বা সুশাসনের কোনো জায়গাই নেই।
একটি স্থিতিশীল, দুর্নীতিমুক্ত, উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণা এখানে পুরোপুরি অচল। বিএনপি আজ যতই জাতীয় ঐক্যের বুলি আওড়াক না কেন, তারা অচিরেই নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে, সমস্ত প্রতিযোগীদের চিরতরে নির্মূল করতে এবং সর্বোপরি, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ওপর তাদের সেই নিরঙ্কুশ একচেটিয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটি এত সহজ হবে না। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের চরম সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ আরও গভীর খাদের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ নতুন করে চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হচ্ছে, যা শাসকশ্রেণির এই আসন্ন দুর্নীতির নগ্ন উল্লাসকে সাধারণ জনতার চোখে আরও বেশি উসকানিমূলক করে তুলবে। জনমনে ক্ষোভের আগুন যত বাড়বে, নতুন করে গণ-অভ্যুত্থান আর গণবিক্ষোভ ততটাই অনিবার্য হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই গোটা ট্র্যাজিক অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কেবলমাত্র বিক্ষোভ আর স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবই যথেষ্ট নয়। পুঁজিবাদ এবং এর পাহারাদার এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে সমূলে উচ্ছেদ করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক দল, যাদের মধ্যে উদারনীতিবাদ বা কোনো নোবেলজয়ীর প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ থাকবে না; এমন একটি দল, যারা খোদ শ্রমিক শ্রেণিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর জন্য আপসহীন লড়াই করবে। তা না হলে, এই ক্রমবর্ধমান মোহভঙ্গ ও হতাশার ফসল শেষ পর্যন্ত ওই ইসলামপন্থীরাই ঘরে তুলবে।
তথাকথিত সমস্ত ‘জেন জি’ বিপ্লবগুলো থেকেও ঠিক একই শিক্ষা তীব্রভাবে ধ্বনিত হচ্ছে। এই বিপ্লবী জনতা যদি নিজেদের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিতে—একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিতে (Revolutionary Communist Party) সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ না হয়, যা পুঁজির একনায়কতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তবে পরিস্থিতি বার বার এমন বিপর্যয়ের দিকেই যাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হয়তো পুরোনো ব্যবস্থা সাময়িকভাবে হেঁচকা টান খেয়েছে, কিন্তু অতীতের সমস্ত বিভীষিকা আজ বহুগুণ বেশি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ফিরে আসছে।
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের সংকট সামগ্রিকভাবে গোটা মানবজাতির আজকের সংকট হলো একটি ভালো বিপ্লবী নেতৃত্বের সংকট। সর্বোচ্চ জরুরি ভিত্তিতে আজ সেই নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। এর বাইরে মুক্তির আর কোনো দ্বিতীয় পথ খোলা নেই।
অনুবাদকঃ নিজার মাহ্রুজ নির্ঝর
